Weekly Bangladesh নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব : মিলাদ ও জিয়ারত প্রসঙ্গ

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু :   |   বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব : মিলাদ ও জিয়ারত প্রসঙ্গ

মাঠের রাজনীতিতে বরাবর সোচ্চার থাকা রাজনীতিবিদ, বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে প্রায় ১৬ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আওয়ামী দুঃশাসনে কারাবরণ, অসংখ্য মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা মাথায় নিয়ে দলের ঐক্য ও সংহতি বজায় রেখে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি তাঁর আস্থা এবং সর্বোপরি দলের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যের উপযুক্ত পুরস্কার লাভ করেছেন।

রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার পর তিনি এখন আর কোনো একক দলের নন। তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে আসীন সবার রাষ্ট্রপতি। আশা করি তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ থেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করবেন এবং রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর ওপর সংবিধান অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো বাধার সম্মুখীন হবেন না।

স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং পরবর্তী সময়ে আরও দুবার সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁর সীমিত ক্ষমতা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘মিলাদ পড়া ও কবর জিয়ারত করা ছাড়া রাষ্ট্রপতির আর কোনো কাজ নেই।’ বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কথাটি সত্য যে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান। তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা নেই।

সরকারের সব নির্বাহী ক্ষমতার এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দায়িত্ব পালনের সুযোগ সংবিধানই দিয়েছে। সংসদে পাস করা বিল রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ছাড়া আইনে পরিণত হয় না। তাঁকে শপথ নিতে হয়েছে : ‘আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।’ তাঁর এই শপথের মধ্যেই বিধৃত যে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর করণীয় বেশ কিছু কাজ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কি তা আছে?

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আমাকে কমনওয়েলথ টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রামের অধীনে এক ফেলোশিপে ভারতের পার্লামেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘ইনস্টিটিউট অব কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজ’-এ অংশগ্রহণ করতে হয়েছিল। ফেলোশিপ প্রোগ্রামে ভারতের রাষ্ট্রপতির এখতিয়ারবিষয়ক একটি কোর্স ছিল। রিসোর্স পারসন হিসেবে একজন ছিলেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ল কমিশন অব ইন্ডিয়ার সদস্য এবং ইন্ডিয়ান ‘ল ইনস্টিটিউট’-এর পরিচালক পি. এম বকশি (পারবিনরাই মুলওয়ানত্রাই বকশি)। তিনি জানান যে ভারতের রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক বা আলংকারিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও লোকসভায় পাস করা কোনো বিল যদি তাঁর কাছে দেশের জনগণের স্বার্থ পরিপন্থি বলে বিবেচিত হয়, তাহলে তিনি তাতে স্বাক্ষর না করে ‘পকেট ভেটো’ প্রয়োগ করে বিলটি আটকে দিতে পারেন।

এ ক্ষেত্রে তিনি দুজন রাষ্ট্রপতির দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছিলেন। জ্ঞানী জৈল সিং ও আর. ভেঙ্কটরমণ। জৈল সিং ছিলেন ভারতের প্রথম শিখ রাষ্ট্রপতি, যাঁকে ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি পদে পছন্দ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাঁকে ভারতের দুর্বল রাষ্ট্রপতিদের একজন বিবেচনা করা হতো। তাঁর সময়ে পার্লামেন্ট ১৯৮৬ সালে ‘পোস্ট অফিস (সংশোধন) বিল’ নামে একটি বিল পাস করে এবং অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতি জৈল সিংয়ের কাছে পাঠানো হলে তিনি তাঁর আপত্তিসহ বিলটি পার্লামেন্টে ফেরত পাঠান।

তাঁর আপত্তির কারণ ছিল, এই বিলে কারও চিঠিপত্র সন্দেহজনক মনে হলে তা সেন্সর করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল সরকারকে। তাঁর মতে, এ ধরনের আইন করা হলে তা হবে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন এবং সংবিধানের স্বীকৃত বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ওপর আক্রমণ। বিলটি আর আইনে পরিণত হতে পারেনি। রাষ্ট্রপতি জৈল সিং এমনকি মন্ত্রিপরিষদের অনেক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাঁর আপত্তি উত্থাপন করতেন, যার ফলে তাঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর বেশ দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব : মিলাদ ও জিয়ারত প্রসঙ্গরাষ্ট্রপতি আর. ভেঙ্কটরমন ১৯৯২ সালে একইভাবে আটকে দিয়েছিলেন পার্লামেন্ট সদস্যদের বেতনভাতা, শতভাগ পেনশনসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধা বৃদ্ধিসংক্রান্ত একটি বিল, যে বিলে কোনো সদস্য যদি এক মাস, এমনকি এক দিনের জন্যও পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে থাকেন, তাঁর ক্ষেত্রেও সুবিধাগুলো প্রযোজ্য হতো। অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে বিলটি আনা হয়েছিল ওই সময়ের লোকসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগের অধিবেশনে এবং তড়িঘড়ি পাস করা হয়েছিল।

কিন্তু পার্লামেন্ট সদস্যরা নিজেরাই নিজেদের সুযোগসুবিধা বাড়িয়ে নিচ্ছেন, এটি সংবাদপত্রে ঝড় তোলে, বিরোধী দল মাঠে নামে এবং পাসকৃত বিল অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হলে তিনি জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিলে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতির চার ধরনের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে পার্লামেন্টে পাস করা বিলে স্বাক্ষর না করার।

কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে অনুরূপ কোনো ভেটো ক্ষমতা দেয়নি। তিনি সাধারণ কোনো বিল সাময়িকভাবে ধরে রাখতে পারেন, কিন্তু জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্ত পরিপন্থি কিছু করতে পারেন না। তিনি পনেরো দিনের মধ্যে তাঁর সম্মতি না জানালে বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আইনে পরিণত হবে। রাষ্ট্রপতি তাঁর কাছে পাঠানো কোনো বিল সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন বিলটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধসহ। কিন্তু রাষ্ট্রপতির অনুরোধ বিবেচনা করার কোনো বাধ্যবাধকতা সংসদের নেই। এ বিষয়টি বিবেচনা করলে কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ‘মিলাদ পড়া ও কবর জিয়ারত করা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।’

বাংলাদেশসহ আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের আদি নিবাস যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ রাজা বা রানি পার্লামেন্টে পাস করা বিলে সম্মতি প্রদানের পরিবর্তে আটকে দিতে পারেন।

আইনগতভাবে তাঁর সে ক্ষমতা বা এখতিয়ার রয়েছে। কিন্তু তিনি তা করেন না এবং গত কয়েক শ বছরেও কোনো রাজা বা রানি তা করেননি। তাঁরা ঐতিহ্যগতভাবে বিবেচনা করেন যে বিলে সম্মতি দিতে অস্বীকার করা হলে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
কিন্তু এর ব্যতিক্রম রয়েছে ইউরোপের আরেকটি সংসদীয় সরকারব্যবস্থার দেশ জার্মানিতে। সেখানে সরকারপ্রধানের পদবি ‘বুন্ডেসানজলার’ বা চ্যান্সেলর এবং যার ওপর সরকারের সব নির্বাহী কর্তৃত্ব ন্যস্ত। তিনি ‘বুন্ডেসট্যাগ’ বা ফেডারেল পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা।

জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধান হচ্ছেন ‘বুন্ডেসপ্রাসিডেন্ট’ বা ফেডারেল প্রেসিডেন্ট। অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের আইন প্রণয়নকাজে সম্মতি দেওয়া ছাড়া আর কোনো এখতিয়ার না থাকলেও আইন প্রণয়নের ওপর জার্মান প্রেসিডেন্টেরও ভারতের রাষ্ট্রপতির মতো ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও তার সাবেক দলের সরকার যদি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনস্বার্থবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করে, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধান তাঁর নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সুবিবেচনাপ্রসূত ও অভিভাবকসুলভ আচরণ করার ক্ষেত্রে জনস্বার্থ প্রাধান্য দেবেন, জনগণ তা আশা করে।

সদ্য দায়িত্বগ্রহণকারী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি রাজনীতির তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে এসেছেন। এখন রাজনীতির বাইরে হলেও অনেকের চেয়ে তিনি দেশের অবস্থা সম্পর্কে ভালো জানেন। সরকার কোন আইনটি জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে করবে, আর কোনটি সংকীর্ণ দলীয় বা ব্যক্তিস্বার্থে করার উদ্যোগ নিচ্ছে, তা উপলব্ধি করতে তাঁর অসুবিধা হবে না। তিনি তাঁর বিজ্ঞতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ পোষণ করবেন, এটাই সবার প্রত্যাশা হওয়া উচিত। বাংলাদেশের ঝঞ্ঝাময় ইতিহাসে বঙ্গভবন নানা ধরনের সরকারব্যবস্থার পরীক্ষানিরীক্ষার প্রত্যক্ষদর্শী। নানা পালাবদলের সাক্ষী এই বঙ্গভবন।

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরেই এখানে বিপুল ক্ষমতাধর শাসকেরা ক্ষমতার ছড়ি ঘুরিয়েছেন। এখান থেকে অনেককে অসম্মানজনকভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। বঙ্গভবন কেবল একটি ভবন নয়, বরং রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান ও প্রতীক। এ ভবনের মহিমান্বিত অধিবাসীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে জনগণের আবেগ ও দেশপ্রেমের চেতনা উপলব্ধি করার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন না। আমরা রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে উপযুক্ত ব্যক্তিত্ব বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি তিনি তাঁর মেয়াদকালে রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক প্রাতিষ্ঠানিকতাকে আদর্শ রূপ দিতে সক্ষম হবেন।

Posted ১২:০৪ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬

Weekly Bangladesh |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আমরা মরি কেন?

(1057 বার পঠিত)

Dr. Mohammed Wazed A Khan, President & Editor
Anwar Hossain Manju, Advisor, Editorial Board
Corporate Office

86-47 164th Street, Suite#BH
Jamaica, New York 11432

Tel: 917-304-3912, 718-523-6299 Fax: 718-206-2579

E-mail: weeklybangladesh@yahoo.com

Web: weeklybangladeshusa.com

Facebook: fb/weeklybangladeshusa.com

Mohammed Dinaj Khan,
Vice President
Florida Office

1610 NW 3rd Street
Deerfield Beach, FL 33442

Jackson Heights Office

37-55, 72 Street, Jackson Heights, NY 11372, Tel: 718-255-1158

Published by News Bangladesh Inc.